কথা গুলো বেশিদিন আগের নয়, এইতো আমাদের কিছু শতকের আগের কথা নিব্বই দশকের যখন সরকারি চাকুরীজীবিদের বেতন ছিল ২৫০০-৩০০০ টাকা। কোন নিম্ন মধ্যবিত্ত কিংবা গরীর পরিবারের কথা বলছি না । সে সময়ে ৭০০ টাকা হলেই একটা চারজনের পরিবার খুব অনায়াসেই খেয়ে পড়ে চলে যেত । ১৫০০ টাকা বেতনেও মাসে সঞ্চয় হত ২০০/৩০০ টাকা । এই সময়ে সেই অর্থমান অবাক করার মতই । অথচ সময়টা আমাদের একদম নিকটবর্তী অতিতের । আর এই বেতন নিয়েও কারও অভিযোগ ছিল না । তখন চালের কেজি ছিল ৮ টাকা । ডিমের হালি ছিল ৪ টাকা । মাংসের কেজি ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকা । ১ কেজি ধান বিক্রি হত ৩ টাকায় । খুব বেশিদিন আগের না ঘটনাগুলো ।
আমাদের একটা সোনার খনি ছিল । জ্বি হা আমরা গরীব দেশ । আমাদের তখনও অভাব ছিল এখনও অভাব আছে । কিন্তু আমরা কখনও অলস ছিলাম না ।
আমাদের একটা সময় ছিল । সে সময়ে শিক্ষকরা ছিলেন এলাকার সবচেয়ে জ্ঞানী এবং সম্মানিত ব্যাক্তি । কোন এলাকায় একজন শিক্ষক থাকলে সে এলাকার লোকজন তাকে একনামে চিনে যেত মাস্টার সাহেব । দুই তিন মহল্লার রিক্সাওয়ালা ভ্যানওয়ালা মাস্টারবাড়ি বললেই আর ঠিকানা দেওয়া লাগতো না , নিয়ে যেত শিক্ষকের বাসায় ।
আমাদের গোলা ভরা ধান ছিল । কৃষিকাজকে তখন মানুষ সম্মান করত । ভালোবেসে কৃষিকাজ করত । কৃষকেরা এই বাংলার মাটিতে সোনা ফলাতো । আমাদের নদীভরা মাছ ছিল । সবুজের সমারোহ ছিল । গাছ ছিল আমাদের । অনেক গাছ ছিল । একদম টাটকা সবুজ ছিড়ে আমরা শ্বাস নিতাম । আম গাছের বড় ডালে উঠে গাছের আম পেড়ে গাছেই বসে খেতাম ।
আমাদের নায়করাজ রাজ্জাক ছিল । সালমানশাহ ছিল। । আমাদের সিনেমা ছিল । সিনেমার গান ছিল। সিনেমার গানগুলো মানুষ মুখে মুখে নিয়ে ঘুরতো ।
আমাদের যৌথ পরিবার ছিল । সবাই একসাথে থাকতো, একসাথে খাইতো । মানুষের মাঝে মহব্বত ছিল । কেউ একজন বিপদে পরলে সবাই এগিয়ে আসতো ।
আমাদের মাঝে জলজ্যান্ত খাটি প্রেম ছিল । চিঠির দেওয়া নেওয়া ছিল । লুকিয়ে চিঠি পড়ার আলাদা একটা দিন আমাদেরই ছিল । আমাদের ছয়টা ঋতু ছিল৷ গ্রামের উৎসব ছিল । বৈশাখি মেলা ছিল । আমাদের দুর্দান্ত কিছু লোক সংগীত ছিল । লোকগীতি, ভাওয়াল, ভাটিয়ালি, জারিগান, সারিগান, ধামের গান ছিল ।
আমাদের নতুন বই পেয়ে ঘ্রাণ নেওয়ার এক আনন্দ ছিল । আমাদের সাইকেল চালিয়ে দূরে মাস্টারের বাসায় যেয়ে প্রাইভেট পড়ার এক অভিজ্ঞতা ছিল । আমাদের শুদ্ধ কিছু মানুষ ছিল । আমাদের সময় রূপকথার গল্প ছিল । বারুদের খেলনা পিস্তল ছিল । গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা, হাডুডু, ফুটবল, ক্রিকেট , হাড়ি পাতিল খেলা, পুতুল বিয়ে , কানামাছি খেলা আরও অনেক রকম খেলা ছিল । আমাদের খেলার মাঠ ছিল ।
সময়টা খুব বেশিদিন আগের না । মাত্র দুইটা যুগ আগের । অনেক তফাত এখন সেই দিনগুলার সাথে আজকের এই দিনগুলার ।
আরও আগে আমাদের বঙ্গবন্ধু ছিল । খাটি আদর্শবান একজন রাজনীতিবিদ ছিল । বাংলার মাটিতে একাই আওয়াজ তুলে শিহরণ এনে দিতো । এমন বজ্রকন্ঠ, এমন বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এমন দরদ ভরা দেশপ্রেমের একজন বঙ্গবন্ধু ছিল ।
আমাদের সবকিছু অল্প ছিল । কিন্তু আমরা খুশি ছিলাম । আফসোস আমাদের, আমরা এমন স্বর্ণালি সময় ধরে রাখতে পারিনি । আমরা তোমাদের এই সময়ে বড়ই বেমানান । আমাদের একবার ফিরে যেতে দাও সেই দিনগুলোতে । আমরা দরদমেখে সেখানেই থেকে যাই । নিজের ভিটেবাড়ি থাকুক আমাদের । আমাদের মাটির ঘর থাকুক । নিজেদের গোরস্থান থাকুক । আবার যৌথ পরিবারে ফিরে যেয়ে একবার আবার একটেবিলে সবাই খেতে বসি আমাদের মাটির ঘরে , এই বাংলার মাটির ঘর । আহা । আমাদের সাদাকালো টিভি, রেডিও ইশ ইশ আরো কত কি । একবার ফিরে যেতে চাই । আমি ওখানেই থেকে যাব । আর আসবো না ফিরে । আমাকে একটাবার ফিরে যেতে দাও সাদা কালোর যুগে । আমি ওখানেই থেকে যাই । আমাদের সাদা কালোই ভালো ছিল । ইস কি সুন্দর দিনগুলো ছিল । ইশ ইশ ইশ ।
কথা ও লেখাঃনাহিদ নিলয় ।

Wow😍😍
ردحذفإرسال تعليق